মঙ্গলবার, ১৮ জানুয়ারী ২০২২ খ্রীষ্টাব্দ | ৫ মাঘ ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

অনিয়মের পাহাড় ডেল্টা লাইফে



 

 

শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত বিমা খাতের কোম্পানি ডেল্টা লাইফে অনিয়মের পাহাড় গড়ে উঠেছে। ব্যাপক অনিয়মে জড়িয়েছে ১৯৯৫ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়া এই কোম্পানিটি। ধারাবাহিক অনিয়মের মধ্যে এবার ভ্যাট ফাঁকির প্রমাণ পেয়েছে ভ্যাট গোয়েন্দা অধিদপ্তর। কোম্পানিটি ২৫ কোটি ৩৪ লাখ ৪৫ হাজার ৬১ টাকার ভ্যাট ফাঁকি দিয়েছে। বৃহস্পতিবার (৯ ডিসেম্বর) বিমা খাতের প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে মামলা করেছে ভ্যাট গোয়েন্দা।

এর আগে ডেল্টা লাইফ ইন্স্যুরেন্সে নিযুক্ত অডিট ফার্ম একনবীনের দেওয়া প্রভিশনাল ইন্টেরিম রিপোর্ট পর্যালোচনা করে বিমা খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) কোম্পানিটির বিরুদ্ধে ব্যাপক অর্থ আত্মসাতের তথ্য পেয়েছে। ইন্টেরিম রিপোর্ট পর্যালোচনায় উঠে আসে, ডেল্টা লাইফ ইন্স্যুরেন্সের স্থগিত হওয়া পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ মানিলন্ডারিংসহ অর্থ আত্মসাৎ ও দুর্নীতি, রাজস্ব ফাঁকি বা বকেয়া এবং অব্যবস্থাপনার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটির ৩ হাজার ৬৮৭ কোটি টাকার ক্ষতি করেছে।

অর্থ আত্মসাত, দুর্নীতি ও রাজস্ব ফাঁকির বিষয়ে বিএসইসির কমিশনার অধ্যাপক ড. শেখ শামসুদ্দিন আহমেদ অর্থসংবাদকে বলেন, ডেল্টা লাইফের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়টি খতিয়ে দেখতে দুইজন কনসালটেন্ট নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তাঁরা কোথায় কি অনিয়ম হয়েছে তা খুঁজে দেখবেন। অনিয়মের যে অভিযোগটি উঠেছে তা সঠিক হলে অবশ্যই অনিয়মকারীদের বিরুদ্ধে কমিশন ব্যবস্থা নিবে।

এছাড়াও তিনি বলেন, কমিশন ডকুমেন্ট হাতে পেলে স্থগিত হওয়া পর্ষদকে অফিসিয়ালি ডাকবে। যারা সাধারণ বিনিয়োগকারীদের টাকা লোপাট করেছে তাদেরকে অবশ্যই অর্থ ফেরৎ দিতে হবে। আর প্রতিষ্ঠানটির নতুন বোর্ডে যারা আসবে তাদেরও বিষয়টি দেখতে হবে। সাধারণ বিনিয়োগকারীদের অর্থ আত্মসাতের সুযোগ যেন প্রতিষ্ঠানটির স্থগিত পর্ষদ না পায় সেজন্যই তাদের ডাকা হবে।

এদিকে ভ্যাট ফাঁকির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকায় ভ্যাট গোয়েন্দার উপ-পরিচালক মুনাওয়ার মুরসালীনের নেতৃত্বে একটি দল বিমা কোম্পানির ২০১৩ সালের জানুয়ারি হতে ২০১৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত তদন্ত করে। ভ্যাট গোয়েন্দার দল তদন্তের স্বার্থে দলিলাদি দাখিলের জন্য প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষকে তলব করে।এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিষ্ঠান কর্তৃক দাখিল বার্ষিক সি.এ. রিপোর্ট, দাখিলপত্র (মূসক-১৯) এবং বিভিন্ন সময়ে প্রতিষ্ঠান কর্তৃক জমা ট্রেজারি চালানের কপি ও অন্যান্য দলিলাদি হতে প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্তের আড়াআড়ি যাচাই করে প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হয়।

ওই প্রতিবেদনে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটি স্বাস্থ্যবিমার ওপর ভ্যাট হিসাবে ১ কোটি ৯ লাখ ৭৬ হাজার টাকা পরিশোধ করেছে। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটির প্রদেয় ভ্যাটের পরিমাণ ছিল ৯ কোটি ৭৮ লাখ ৫১ হাজার ৯৫৫ টাকা। এক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটি প্রকৃত বিক্রয় তথ্য গোপন করেছে। এতে অপরিশোধিত ভ্যাট বাবদ ৮ কোটি ৬৮ লাখ ৭৫ লাখ ৯৫৪ টাকার ফাঁকি উদঘাটন করা হয়। যেখানে মাসিক ২ শতাংশ হারে ১০ কোটি ১ লাখ ১১ হাজার ৮৫৩ টাকা সুদ হিসেবে প্রযোজ্য।

এছাড়া উৎসে ভ্যাট বাবদ ২ কোটি ৯৫ লাখ ৮ হাজার ৫৮৯ টাকার ফাঁকি উদঘাটিত হয়। আর প্রতিষ্ঠানটির স্থান ও স্থাপনার ভাড়ার বিপরীতে বকেয়াকৃত ভ্যাট ১২ লাখ ৪৯ হাজার ৭১৯ টাকা। এভাবে তদন্ত মেয়াদে প্রতিষ্ঠানটি সর্বমোট অপরিশোধিত ভ্যাটের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১১ কোটি ৭৬ লাখ ৩৪ হাজার ২৬২ টাকা এবং সুদ বাবদ ১৩ কোটি ৫৮ লাখ ১০ হাজার ৭৯৯ টাকাসহ সর্বমোট ২৫ কোটি ৩৪ লাখ ৪৫ হাজার ৬১ টাকা ভ্যাট ফাঁকি দিয়েছে ডেল্টা লাইফ ইনস্যুরেন্স।

উৎসে কর্তনের উপর প্রযোজ্য এই ফাঁকি দেওয়া ভ্যাটের উপর ভ্যাট আইন অনুসারে মাস ভিত্তিক ২ শতাংশ হারে ৩ কোটি ৪৪ লাখ ৮৯ হাজার ৬৯৭ টাকা সুদ আদায়যোগ্য হবে। অন্যদিকে, তদন্ত মেয়াদে প্রতিষ্ঠানটি স্থান ও স্থাপনার ভাড়ার বিপরীতে ৩ কোটি ১৮ লাখ ১৮ হাজার ৬৯১ টাকা পরিশোধ করেছে। এক্ষেত্রে ভ্যাট ফাঁকির উপরও আইন অনুসারে মাস ভিত্তিক ২ শতাংশ হারে ১২ লাখ ৯ হাজার ২৫০ টাকা সুদ প্রযোজ্য হবে।

তদন্ত মেয়াদে প্রতিষ্ঠানটির সর্বমোট অপরিশোধিত ভ্যাটের পরিমাণ ১১ কোটি ৭৬ লাখ ৩৪ হাজার ২৬২ টাকা। এছাড়া সুদ বাবদ ১৩ কোটি ৫৮ লাখ ১০ হাজার ৭৯৯ টাকাসহ সর্বমোট ২৫ কোটি ৩৪ লাখ ৪৫ হাজার ৬১ টাকা রাজস্ব পরিহারের তথ্য উদঘাটিত হয়।

এছাড়া গ্রাহকের স্বার্থ ক্ষুণ্ন করার কারণে চলতি বছরের ১১ ফেব্রুয়ারি ডেল্টা লাইফ ইন্স্যুরেন্সের পরিচালনা পর্ষদ চার মাসের জন্য স্থগিত করে বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)। একইসঙ্গে কর্তৃপক্ষের সাবেক সদস্য সুলতান-উল-আবেদীন মোল্লাকে ওই বিমা কোম্পানিতে প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এরপর ১০ জুন ডেল্টা লাইফের পরিচালনা পর্ষদ সাসপেন্ডের মেয়াদ বৃদ্ধি করে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত অব্যাহত রাখার আদেশ দেয় আইডিআরএ। নির্ধারিত উদ্দেশ্যগুলো পূরণ না হওয়ায় এ আদেশ জারি করা হয়।সর্বশেষ গত ১৩ অক্টোবর কর্তৃপক্ষের সাবেক সদস্য মো. কুদ্দুস খানকে ডেল্টা লাইফে প্রশাসকের দায়িত্ব দিয়েছে আইডিআরএ।

এর আগে, চলতি বছরের ৭ ফেব্রুয়ারি আইডিআরএ চেয়ারম্যান ড. এম মোশাররফ হোসেনের বিরুদ্ধে ঘুষ দাবি করার অভিযোগ করে সংবাদ সম্মেলন করে ডেল্টা লাইফ ইন্স্যুরেন্সের তৎকালীন পরিচালনা পর্ষদ।

সংবাদ সম্মেলনে ডেল্টা লাইফের নির্বাহী পরিচালক চৌধুরী কামরুল আহসান বলেন, বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের বর্তমান চেয়ারম্যান যিনি এক সময় ডেল্টা লাইফের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ছিলেন। এ জন্য উদ্দেশ্যমূলকভাবে ডেল্টা লাইফের ২০১৯ সালের একচুয়ারিয়াল ভ্যালুয়েশনের বেসিস অনুমোদন দেয়া হয়নি। মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তার নবায়ন অনুমোদন না দিয়ে এবং কোম্পানিকে নানা অজুহাতে অন্যায়ভাবে জরিমানা আরোপের হুমকি দিচ্ছেন আইডিআরএ চেয়ারম্যান। এছাড়া কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদ বহিষ্কার করে প্রশাসক নিয়োগেরও হুমকি দিচ্ছেন।

চাঁদা দাবির অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, বিভিন্ন বিষয় সমাধানের জন্য বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানের সঙ্গে আলোচনা করতে গেলে তিনি কোম্পানির কাছে প্রথমে ২ কোটি, পরে ১ কোটি ও সর্বশেষ ৫০ লাখ টাকা উৎকোচ দাবি করেন। এ সংক্রান্ত অডিও ক্লিপ ও ট্রান্সক্রিপটি দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) অভিযোগ আকারে দাখিল করা হয়েছে। পরে এ বিষয়ে হাইকোর্ট বিভাগ অধিকতর তদন্ত করার আদেশ দেন। ডেল্টা লাইফ ইন্স্যুরেন্সের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা আদিবা রহমান ওই সংবাদ সম্মেলনে বলেন, আইডিআরএ’র চেয়ারম্যান আমাদের কাছে ঘুষ চেয়েছিলেন। আমরা সেই ঘুষ না দেয়ায় তিনি ক্ষুব্ধ হয়েছেন।

ড. এম মোশাররফ হোসেনের বিরুদ্ধে অভিযোগ করার চার দিনের মাথায় ডেল্টা লাইফ ইনস্যুরেন্স লিমিটেডের তৎকালীন পরিচালনা পর্ষদ স্থগিত করে আইডিআরএ। একই সঙ্গে বিমা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের সাবেক সদস্য সুলতান-উল-আবেদীন মোল্লাকে প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। পরবর্তীতে ১৩ অক্টোবর কর্তৃপক্ষের সাবেক সদস্য মো. কুদ্দুস খানকে এ দায়িত্ব দেওয়া হয়।

এদিকে, ডেল্টা লাইফ ইন্স্যুরেন্স শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হয় ১৯৯৫ সালে। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের দেয়া তথ্য অনুযায়ী চলতি বছরের অক্টোবর পর্যন্ত কোম্পানিটিতে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ৪৪ দশমিক ২৫ শতাংশ শেয়ার রয়েছে। তবে সর্বশেষ দুই অর্থবছরে (২০৯, ২০২০) সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কোন লভ্যাংশ দেয়নি ডেল্টা লাইফ।

শেয়ারবাজারে কোম্পানিটি ১৯৯৫ সালে তালিকাভুক্ত হলেও সর্বপ্রথম নগদ লভ্যাংশ দেয় ২০১৫ সালে। ওই বছর বিনিয়োগকারীদের ১৮ শতাংশ লভ্যাংশ দেয় প্রতিষ্ঠানটি। পরবর্তীতে ২০১৬ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত তিন বছর যথাক্রমে ২০, ২৫ ও ২৬ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দেয়।