মঙ্গলবার, ১৮ জানুয়ারী ২০২২ খ্রীষ্টাব্দ | ৫ মাঘ ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

ছাতকে বৃদ্ধি পাচ্ছে বিনিয়োগকারী সৃষ্টি হচ্ছে কর্মসংস্থান



তমাল পোদ্দার, ডেইলি ছাতক:
সুনামগঞ্জের ছাতকে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ঐতিহ্য রয়েছে ২৫০ বছরেরও বেশী সময়ের। তাই বিনিয়োগ ক্ষেত্রে ওই অঞ্চলের গুরুত্ব ক্রমশই বৃদ্ধি পাচ্ছে। সড়ক, রেল ও নৌপথে যোগাযোগ ব্যবস্থা দেশের খুব কম অঞ্চলেই পাওয়া যায়। এক্ষেত্রে এখানে যোগাযোগের কোন কমতি নেই। বিভিন্ন শিল্পের কাঁচামাল ও শ্রমিকের সহজ লভ্যতা বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করে অতি সহজেই। ইতিমধ্যেই দেশী-বিদেশী বিনিয়োগকারী এখানে গড়ে তুলেছেন ছোট-বড় শিল্প প্রতিষ্টান।
আর ওই সুবাদে সৃষ্টি হচ্ছে কর্মসংস্থান। স্থানীয় অনেক বেকার যুবক কাজ করতে দেখা গেছে ওই সব শিল্প প্রতিষ্ঠানে। সম্প্রতি আরও বিনিয়োগকারী ওই উপজেলার বিভিন্ন স্থান পরিদর্শন করে গেছেন। ভারত সংলগ্ন পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত প্রকৃতি প্রদত্ত এখানের পাথর ও বালির সুনাম রয়েছে দীর্ঘ দিনের। বৃটিশ ব্যবসায়ী জর্জ হেনরী ও লাট সাহেবের মত অনেকেই এসে ম্যাকলীন কিলবার্ন নামক পাথর ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। ১৯৪০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশের প্রথম সিমেন্ট কারখানা ছাতক সিমেন্ট ফ্যাক্টরী।
প্রতিষ্ঠালগ্নে যার নাম ছিল আসাম-বেঙ্গল সিমেন্ট ফ্যাক্টরী। বার্ষিক সিমেন্ট উৎপাদন ক্ষমতা ২ লক্ষ ৩৩ হাজার মে.টন। এশিয়ার একমাত্র প্রাচীনতম সিমেন্ট কারখানাটি সুরমার ঠিক তীরে অবস্থিত। বর্তমানে সেটিকে আরো আধুনিকায়নের কাজ চলছে। ড্রাই প্রসেসের মাধ্যমে সিমেন্ট উৎপাদন বৃদ্ধি ও বাজারে ব্যাপক প্রসার ঘটানোর লক্ষ্য নিয়ে তারা এগোবেন। কারখানার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভাষ্য, সেটি সম্ভব হয়েছে স্থানীয় এমপি মুহিবুর রহমান মানিকের ঐক্যান্তিক প্রচেষ্টায়। সিলেট পাল্প এন্ড পেপার মিল্স গড়ে উঠেছিল স্বাধীনতা উত্তরকালে। যদিও পরবর্তীতে কারখানাটি বন্ধ হয়ে যায়। তার পরও একই যায়গায় নতুন মালিকানায় নতুন নামে আরেকটি শিল্প কারখানা গড়ে ওঠে।
১শ’ ৭০ একর ভূমির উপর ভারতের সাথে যৌথ ব্যবস্থাপনায় অসংখ্য মিল কারখানা স্থাপন করে এখানে ইকোনোমিক জোন গড়ে তোলা হবে। বর্তমানে তারা কার্টিজ পেপার উৎপাদন করে দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও রপ্তানি করছে। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, নিটল নিলয় গ্রুপ ওই স্থানে সিমেন্ট ফ্যাক্টরীসহ বিভিন্ন ধরনের কারখানা গড়ে তোলার জন্য উদ্যোগ নিয়েছে। সম্প্রতি নিটল নিলয় গ্রুপের চেয়ারম্যান আব্দুল মাতলুব আহমাদ ছাতকের কারখানায় এসে এমনটিই ইঙ্গিত দিয়েছেন। তিনি কারখানা পরিদর্শনে এসে বলেছেন, ওই কারখানায় অতীতের স্মৃতি ধরে রাখতে প্রয়োজনে নতুন পাল্প মেশিন স্থাপন করা হবে। শীগ্রই এখানে টিস্যু পেপার ও বেটারী তৈরীর কারখানা হবে।
নিটল মটরস লিমিটেডের সেকেন্ড ডিপু করার ঘোষণাও দিয়েছেন তিনি। আর ওই লক্ষ্য নিয়েই কাজ করছেন এখানের শ্রমিকরা। দেশের একমাত্র সরকারি কংক্রীট স্লীপার কারখানাও গড়ে উঠে ওই অঞ্চলে।
এখানে বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ বহুজাতিক ও এশিয়ার বৃহত্তম লাফার্জ-হোলসিম সিমেন্ট কারখানা গড়ে উঠে। ২শ‘ ৫৫ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগে ফ্রান্সের অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ভিত্তিক বার্ষিক ১.২ মিলিয়ন টন উৎপাদন ক্ষমতা সম্পন্ন এশিয়ার সর্ববৃহৎ সিমেন্ট উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ছাতকস্থ লাফার্জ-হোলসিম সিমেন্ট কারখানা শহরের সুরমা নদীর উত্তর পাড় টেংগারগাঁও ও নোয়ারাই গ্রামের মাঝামাঝি এলাকায় গড়ে উঠে। কারখানার প্রধান কাঁচামাল চুনাপাথর ভারতের মেঘালয় রাজ্যের পূর্ব খাশিয়া বনভূমি এলাকার ১শ‘ ১৬ হেক্টর খনি আর্ন্তজাতিক চুক্তির মাধ্যমে লিজ গ্রহন করে লাফার্জ। ভারতের খনি প্রকল্প থেকে লাফার্জের অভ্যন্তর পর্যন্ত চুনাপাথর পরিবহনের জন্য স্থাপন করা হয় ১৭ কিলোমিটার সয়ংক্রিয় কনভেয়ার বেল্ট।
২০০৬ সালের অক্টোবর মাস থেকে লাফার্জ সিমেন্ট কারখানা বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন শুরু করে। এশিয়ার বৃহত্তম এ সিমেন্ট কারখানা স্থাপনের পর থেকে ছাতক তথা দেশের অর্থনীতিতে একটি নতুন মাত্রা যোগ হয়। চুন শিল্পে ছাতকের ঐতিহ্য ২৫০ বছরেরও বেশী সময়ের। অত্যাধুনিক পদ্ধতিতে এ শিল্পের আরো ব্যাপক প্রসার ঘটানো সম্ভব। সর্বশেষ শহরের শ্যামপাড়া এলাকায় দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্প গ্রুপ আকিজ গ্রুপ বিশাল বাজেট নিয়ে কারখানার যাত্রা শুরু করে। এখানে বিভিন্ন প্লাস্টিক পণ্য উৎপাদন করা হয়।
ওই কারখানার সুবাদে স্থানীয় অনেক যুবক-যুবতীর কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। শুধু আকিজ ফ্যাক্টরী নয় অন্যান্য কারখানায়ও স্থানীয়দের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে লোকজন এসে কাজ করছেন। এখানে মিল কারখানা গড়ে ওঠায় স্থানীয় এলাকার উন্নয়নসহ নতুন নতুন বাজার গড়ে উঠছে। এসব বাজারে বেশীর ভাগ ব্যবসায়ীই নতুন মুখ। খুচরা ব্যবসার মাধ্যমে এখন তাদের নতুন আয়ের উৎস তৈরী হচ্ছে। আবার লক্ষ্যনীয় বিষয় হচ্ছে, কারখানা যে এলাকায় গড়ে উঠছে সেই সব এলাকার আশ-পাশের জমি ও ভ’মির দাম আগের তুলনায় অনেক গুন বৃদ্ধি পেয়েছে। অনেকেই বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা গ্রহণের জন্য কারখানার আশ-পাশে নতুন করে জায়গা কিনতে দেখা গেছে।
বিভিন্ন ব্যবসায়ীর সাথে আলাপ করে জানা যায়, শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়তে হলে সহজ যোগাযোগ ব্যবস্থা, কাঁচামাল ও শ্রমিক প্রয়োজন। পাশাপাশি বিনিয়োগকারীরা তাদের নিরাপত্তা ও সংশ্লিষ্ঠ সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে চান। ওই দিক দিয়ে শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার মতো সকল উপাদানই ছাতকে বিদ্যামান রয়েছে।
এব্যাপারে স্থানীয় সংসদ সদস্য মুহিবুর রহমান মানিক বলেন, সম্প্রতি অনেক বিনিয়োগকারী এলাকা পরিদর্শন করে গেছেন। ভবিষ্যতে ওই অঞ্চলে বিনিয়োগকারীরা আরো বড় ধরনের বিনিয়োগ করতে আগ্রহী রয়েছেন।